বাড়ি ঘর সব ই আছে তবু মায়ার টানে জঙ্গলাবৃত ভগ্নপ্রায় হোস্টেলে দম্পতি, রাজার সৃষ্টি ও গ্রামের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টায় তারা। স্কুলের হোস্টেল তৈরি হয়েছিল 1910 সালে। পশ্চিম বর্ধমান জেলার বারাবনি এলাকার এথরা গ্রামে তৈরি স্কুলের হোস্টেল আজ জরাজীর্ণ, জঙ্গলাবৃত। তবু স্মৃতি এবং ঐতিহ্য কে বাঁচিয়ে রাখতে সামিল স্বামী ও স্ত্রী। হ্যাঁ, স্বামী আনন্দ বাবুর ওই গ্রামেই নিজের বাড়ি রয়েছে। আছে ছেলে , ছেলের বউ, নাতি নাতনি। ভরা সংসার।
তবু ঠাঁই নিয়েছেন ভেঙেপরা হোস্টেলের এক কোণে। সারাদিন থাকেন মশারির ভেতর। আর সন্ধ্যায় ফিরে যান বাড়িতে। শুধু তাই নয়, বাড়ি থেকেই আসে খাবার দাবার। আর একটু চা জল ফোটানোর ব্যবস্থা রেখেছেন হোস্টেলেই। কিন্তু কেন ? সব কিছু থাকতে কেন এত কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছেন দম্পতি ? প্রশ্ন করতেই মশারির ভেতর থেকে আনন্দ বাবু বলেন….
শুধু ই মায়া। মায়ার জালে আটকা পড়েছি। 70 বছরের বেশি হোস্টেল টাকে দেখছি। এক সময়ে কত দূর দূর থেকে ছেলে রা পড়তে আসত। মাস্টার রা থাকত। 30 এর বেশি রুম ছিল। ছিল 150 এর বেশি ছাত্র আর শিক্ষক। খিচুড়ি হত। ডিমের তরকারি।বার কত কি। দাদু বাবা থেকে আনন্দ বাবু সবাই কাজ করেচে হোস্টেল এ। মায়া ছাড়তে পারছি না। কোনো বেতন নেই, লোক জন নেই।
মায়ার টানে , ভগ্নপ্রায় হোস্টেলে
নেই কোনো কমিটি। দিনের পর দিন ভাঙতেই চলেছে হোস্টেল বাড়ি। তবু এখানে থাকায় চোরেদের হাত পড়েনি এখনো। কিন্তু সে সব বিষয় নয়। মায়ার জালে আবদ্ধ হয়ে চরম কষ্ট সহ্য করে সকাল থেকে বিকেল পার করা। তীব্র মশার কারণে সব সময় মশারি আর জঙ্গলাবৃত ভগ্নপ্রায় হোস্টেল বাড়ি যেন তার মায়ার জাল। শুধু আনন্দ বাবু ই নয়। হাসি মুখে দিন কাটাচ্ছেন তার স্ত্রী দাসী। বিয়ের পর সন্তানের জন্ম দেবার পর ই চলে এসেছেন স্বামীর টানে। আর তারপর ই মায়ার জালে আটকে পড়েছেন।
subscribe in youtube “TSNM News“
চলে এসেছি সন্তানের জন্মের পর। আছে সব কিছু ই। বাড়িতে সরকারি চাকরি ও আছে। তবু কেমন জানি মায়াতে আটকে আছি। এই হোস্টেলে 10 টাকা মাইনে তে কাজ করেছি। রান্না করে সবাইকে খাইয়ে ছি। রান্না করা, বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা সব ই নিজে হাতে। মায়া ছাড়তে পারি না। খাবার দাবার বাড়ি থেকেই আসে। চট পেতে শুয়ে থাকি। সময় কাটাই।
না আনন্দ বাবু বা তার স্ত্রী দাসী এর কোনো স্বার্থ নেই। অনেক বছর থেকে দেখেছেন হোস্টেল কে। মনে এখনো আশা জাগে.…যদি আবার আগের দিন ফিরে আসে। আবার যদি খিচুড়ি রান্না হয়। আবার যদি বাসন মাজতে হয়। মাস্টার আসে। ছাত্র রা হোস্টেলে থাকে। কলকাতা, শিলিগুড়ি, বর্ধমান সহ বহু জেলার ছাত্র রা তো এখানেই থাকত।
কিন্তু তা কি আর হবে ? এই ভাবনায় ভাবায় আনন্দ আর দাসী কে। তাও গ্রামের ঐতিহ্য এবং রাজা মনিন্দ্রচন্দ্রের স্মৃতিকে রক্ষা করে চলেছে এই দম্পতি…শুধু ই মায়ার টানে।

